আলো-ছায়ার ইতিহাসকে আগলে রাখা এক সংগ্রাহক
বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের এক স্পর্শেই ছবি তোলা যায়। কিন্তু এমন এক সময় ছিল যখন একটি ছবি তুলতে প্রয়োজন হতো ধৈর্য, দক্ষতা এবং বিশেষ প্রযুক্তির। সেই অতীতকে আজও জীবন্ত করে রেখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার নিত্যানন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা দেবীপ্রসাদ মণ্ডল। পেশায় তিনি একজন আলোকচিত্রী হলেও, তাঁর আরেকটি পরিচয় তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে—তিনি একজন বিরল ও ঐতিহাসিক ক্যামেরা সংগ্রাহক। পাশাপাশি তিনি দুর্গাপুর ফিলাটেলিক অ্যান্ড নিউমিসম্যাটিক সোসাইটির (Durgapur Philatelic and Numismatic Society) সদস্য, যা ইতিহাস, সংগ্রহ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় বহন করে।
তিন দশকের নিরলস সংগ্রহ
প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে দেবীপ্রসাদের এই অনন্য সংগ্রহশালা। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫০টিরও বেশি ভিন্টেজ ও আধুনিক ক্যামেরা। জাপান, জার্মানি, আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার মতো দেশের বিভিন্ন যুগের ক্যামেরা স্থান পেয়েছে তাঁর সংগ্রহে।
এই সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ একটি ১৯১০ সালের জাপানি কাঠের স্টুডিও ক্যামেরা। একসময় এই ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করে আলোকচিত্রীরা মাথার উপর কালো কাপড় টেনে ছবি তুলতেন। বর্তমানে এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং আলোকচিত্রের ইতিহাসের এক মূল্যবান সাক্ষী।
বিরল ক্যামেরার সম্ভার
দেবীপ্রসাদের সংগ্রহে রয়েছে বিভিন্ন যুগের বহু বিখ্যাত ক্যামেরা ব্র্যান্ডের মডেল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- Kodak
- Agfa
- Yashica
- Minolta
- Zeiss
- Rolleiflex
- Ricoh
- Cosina
- Voigtländer
- Zenit
- Praktica
প্রতিটি ক্যামেরাই যেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের গল্প বলে।
শুধু ক্যামেরা নয়, আলোকচিত্রের সম্পূর্ণ ইতিহাস
দেবীপ্রসাদের সংগ্রহ কেবল ক্যামেরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সংগ্রহ করেছেন পুরনো দিনের বিভিন্ন আলোকচিত্র সরঞ্জামও। এর মধ্যে রয়েছে:
- ফ্ল্যাশ বাল্ব
- বিভিন্ন আকারের নেগেটিভ
- লাইট মিটার
- ফিল্ম রোল
- ডার্করুমে ব্যবহৃত সরঞ্জাম
একসময় ছবি তোলার জন্য ছোট ক্যামেরায় ছোট ফিল্ম এবং বড় ক্যামেরায় বড় ফিল্ম ব্যবহার করা হতো। আলো মাপার জন্য ব্যবহৃত হতো বিশেষ লাইট মিটার। আজকের ডিজিটাল যুগে এসব যন্ত্র প্রায় ইতিহাসে পরিণত হলেও দেবীপ্রসাদের সংগ্রহে সেগুলো এখনও সযত্নে সংরক্ষিত।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক স্বপ্ন
দেবীপ্রসাদের কাছে এই সংগ্রহ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শখ নয়। তিনি চান তাঁর সংগ্রহশালা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আলোকচিত্রের ইতিহাসকে তুলে ধরুক। তাঁর স্বপ্ন, একদিন এই বিরল ক্যামেরাগুলি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর বা প্রদর্শনী গড়ে উঠবে, যেখানে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে কীভাবে ক্যামেরা ও আলোকচিত্র প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে।
উপসংহার
ডিজিটাল যুগে যখন প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি তোলা হচ্ছে, তখন অতীতের ক্যামেরাগুলিকে সংরক্ষণ করা নিছক সংগ্রহশালা গড়ে তোলা নয়—এটি ইতিহাস রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দেবীপ্রসাদ মণ্ডলের এই সংগ্রহশালা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি ক্যামেরার পেছনেই লুকিয়ে আছে সময়, প্রযুক্তি এবং মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য গল্প।
আলোকচিত্র, ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রহ—এই তিন ক্ষেত্রেই তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে একজন প্রকৃত ঐতিহ্য-সংরক্ষকে পরিণত করেছে। তাঁর এই প্রচেষ্টা শুধু আলোকচিত্রপ্রেমীদের নয়, ইতিহাস ও প্রযুক্তি অনুরাগীদের কাছেও এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
